শরিয়াহ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম বাংলাদেশ
শরিয়াহ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম বাংলাদেশ
বাংলাদেশে ৯০ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠী মুসলিম হওয়ায় এখানে সম্পত্তি বণ্টন মূলত মুসলিম ব্যক্তিগত আইন — সাধারণত হানাফি মাজহাব — অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। অনেক পরিবার সম্পত্তি ভাগ করার সময় "যার যা মনে হয়" ভিত্তিতে মৌখিক আপোসে চলে যায়, যা পরবর্তীতে আইনি জটিলতা ও পারিবারিক বিরোধের জন্ম দেয়। এই লেখায় শরিয়াহ অনুযায়ী কে কতটুকু অংশ পাবেন তার সুনির্দিষ্ট নিয়ম ব্যাখ্যা করা হলো।
স্বয়ংক্রিয় বণ্টনের নীতি
কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার সম্পত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনগতভাবে ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায় — এর জন্য আলাদা কোনো "উইল" বা ঘোষণার প্রয়োজন নেই। তবে বাস্তবে কে কতটুকু পাবেন তা নির্ভুলভাবে হিসাব করার জন্য পরিবারের সব জীবিত সদস্যের তালিকা এবং তাদের সম্পর্ক জানা আবশ্যক।
নির্দিষ্ট অংশপ্রাপ্ত ওয়ারিশ (Sharers)
কোরআন ও হাদিস দ্বারা নির্দিষ্ট অংশপ্রাপ্ত ওয়ারিশদের মধ্যে সর্বাগ্রে সম্পত্তি বণ্টন করতে হয়:
- স্ত্রী: সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন; সন্তান না থাকলে পাবেন ১/৪ অংশ। একাধিক স্ত্রী থাকলে তারা এই অংশ নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেবেন।
- স্বামী: সন্তান থাকলে ১/৪ অংশ এবং সন্তান না থাকলে ১/২ অংশ পাবেন।
- পিতা: মৃত ব্যক্তির সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে ১/৬ অংশ পাবেন।
- মাতা: সন্তান থাকলে বা একাধিক ভাই-বোন থাকলে ১/৬ অংশ পাবেন; অন্যথায় ১/৩ অংশ পাবেন।
অবশিষ্ট অংশপ্রাপ্ত বা আসাবা (Residuaries)
নির্দিষ্ট অংশীদারদের হিস্যা দেওয়ার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে, তা আসাবাদের মধ্যে বণ্টিত হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো — পুত্র পাবেন কন্যার দ্বিগুণ অংশ (অনুপাত ২:১)। অর্থাৎ যদি একজন পুত্র ও একজন কন্যা আসাবা হিসেবে অবশিষ্ট সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন, তাহলে পুত্র দুই ভাগ পাবেন এবং কন্যা এক ভাগ পাবেন।
বিনামূল্যে ডাউনলোড
Bangladesh — Estate Settlement Checklist নিন
এই পুরো লেখাটি প্রিন্টযোগ্য চেকলিস্ট হিসেবে — সঙ্গে অ্যাকশন প্ল্যান ও রেফারেন্স গাইড, আজ থেকেই ব্যবহার করতে পারবেন।
আউল ও রাদ্দ নীতি
কখনো কখনো নির্দিষ্ট অংশীদারদের হিস্যার যোগফল সম্পূর্ণ সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে (যেমন অংশীদার সংখ্যা বেশি হলে), তখন 'আউল' নীতি অনুযায়ী আনুপাতিক হারে সবার অংশ সামান্য কমিয়ে দেওয়া হয়। বিপরীতে, নির্দিষ্ট অংশীদারদের হিস্যা দেওয়ার পর যদি সম্পত্তি উদ্বৃত্ত থাকে এবং কোনো আসাবা না থাকে, তবে 'রাদ্দ' নীতি অনুযায়ী সেই উদ্বৃত্ত অংশ পুনরায় অংশীদারদের মধ্যে আনুপাতিক হারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
উইল (ওসিয়ত) এর সীমাবদ্ধতা
মুসলিম আইনে একজন ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অংশ উইল করতে পারেন। এর অতিরিক্ত অংশ উইল করতে হলে বা কোনো প্রকৃত উত্তরাধিকারীর অনুকূলে উইল করতে হলে, উইলদাতার মৃত্যুর পর অন্য সকল ওয়ারিশের লিখিত সম্মতি প্রয়োজন। এই সম্মতি ছাড়া নির্দিষ্ট ওয়ারিশের পক্ষে করা উইল আইনত অবৈধ বলে গণ্য হয়।
হেবা বনাম উইল
জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরের আরেকটি পদ্ধতি হলো হেবা — অর্থাৎ কোনো প্রতিদান ছাড়াই সম্পূর্ণ সম্পত্তি অন্য কাউকে দান করা। হেবা কার্যকর হতে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়: দাতার স্পষ্ট ঘোষণা, গ্রহীতার গ্রহণ, এবং সম্পত্তির প্রকৃত দখল হস্তান্তর। মৃত্যুশয্যায় করা হেবা বা প্রতারণামূলক উদ্দেশ্যে করা হেবা পরবর্তীতে আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য।
বোনদের হক ছেড়ে দেওয়া বৈধ নয়
বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে অনেক সময় বিবাহিতা বোনেরা ভাইদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পিতার সম্পত্তি থেকে নিজেদের দাবি মৌখিকভাবে ছেড়ে দেন। কিন্তু আইনত মৌখিক বা অনানুষ্ঠানিক উপায়ে এভাবে হক ছেড়ে দেওয়া বৈধ নয়। পরবর্তীতে বোনের সন্তানরা সেই দাবি পুনরায় উত্থাপন করলে দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হতে পারে, তাই যেকোনো ত্যাগ বা ছাড় লিখিত ও নিয়মিত রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমেই করা উচিত।
শরিয়াহ অনুযায়ী হিস্যার হিসাব জটিল হতে পারে, বিশেষ করে যখন একাধিক শ্রেণির ওয়ারিশ একসাথে উপস্থিত থাকেন। ভুল হিসাবের কারণে পরবর্তীতে বণ্টননামা দলিল বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমাদের মূল্যের সম্পূর্ণ গাইডে বিভিন্ন পারিবারিক পরিস্থিতির জন্য হিস্যা হিসাবের উদাহরণ এবং বণ্টননামা দলিল প্রস্তুতের সম্পূর্ণ ধাপ দেওয়া আছে। উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টন গাইড দেখে নিন।
Bangladesh — Estate Settlement Checklist বিনামূল্যে নিন
Bangladesh — Estate Settlement Checklist ডাউনলোড করুন — চেকলিস্ট, টেমপ্লেট ও অ্যাকশন প্ল্যানসহ প্রিন্টযোগ্য গাইড, আজ থেকেই ব্যবহার করতে পারবেন।